বড্ড আনন্দ হচ্ছে। কতটা আনন্দ হচ্ছে - আমি বলে বোঝাতে পারব না। মনে হচ্ছে আমার খুব কাছের মানুষ, পাশের বাড়ির মানুষ, আমারই বন্ধু এই পুরস্কারটি পেয়েছেন।
পরিমল ভট্টাচার্য আমার কাছে ভীষণ কাছের এক লেখক। তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় বড় বয়সে—বরং বলা ভালো, ঠিক সেই বয়সে, যখন আমি মানুষ, জীবনযাপন বুঝতে শিখেছি, সমাজের সঙ্গে নিবিড় যোগ অনুভব করেছি। ঠিক সেই সময় আমার হাতে আসে দার্জিলিং। আমি চমকে যাই—এই দার্জিলিং তো সেই দার্জিলিং নয়; এটা তো সেই ট্যুরিস্টদের মল, গ্লেনারিজ, গোল্ডেন টিপস, টাইগার হিল ইত্যাদি নয়। এটা আমার পাশেই অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকা মানুষগুলোর দৈনন্দিন আখ্যান।
আমার কানে বাজে, চোখের সামনে ঘোরাঘুরি করে ভুটিয়া বস্তিতে হারিয়ে যাওয়া লেখকের বন্ধুর মুখ। আর বারবার ফিরে আসে—“শৈলরানি, তুমি কার?” সেখান থেকেই শুরু হলো তাঁর লেখায় ডুবে যাওয়া।
কোভিডকালে মানুষের জীবনকে বেশ কাছ থেকে জানছিলাম—মানুষ বলতে তারা নয়, যারা কোভিডের সময় নানা খাবার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে পেরেছিলেন; মানুষ বলতে তারা, যাদের হাতে পোড়া রুটি ছিল, আর যাদের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে গিয়েছিল। হাজার হাজার কিলোমিটার হেঁটেও ঘরে ফেরা হলো না যাদের। কী খাবে, কীভাবে চলবে, কে খাওয়াবে, কারা দায়িত্ব নেবে, কেন সরকার দায়িত্ব নেয় না—এসব যখন মাথার মধ্যে ঘুরছে, তখনই পরিমলবাবুর আবির্ভাব আমার জীবনে।
আরো পড়ুন: কেন এই ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ? ব্যারেজের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে কেন?
দার্জিলিং আমি প্রায় তিনবার পড়েছি ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। যে দার্জিলিং-কে এর আগে আমি চিনিনি। তারপর ২০২২-এর এপ্রিল থেকে গোগ্রাসে পড়া শুরু করি ডোডোপাখিদের গান, নাহুমের গ্রাম, শাংগ্রিলার খোঁজে—এক নিঃশ্বাসে পড়ছি, পড়েই যাচ্ছি, থামছি না। থামছি না কারণ এগুলো যে আসলে বই—সেটা অনুভবই করতে পারছি না। এগুলো যেন আমারই নানা অবস্থানের কথা। মানুষের কথা এভাবে কেউ লিখে যেতে পারে? সমাজের সঙ্গে কতটা অটুট যোগ থাকলে এমন লেখা সম্ভব!
এর আগে পর্যন্ত ভ্রমণসাহিত্যের আলাদা এক ধারা ছিল। কিন্তু সেই ভেদরেখা মুছে দিয়েছেন লেখক। দার্জিলিং হোক, নাহুমের গ্রাম হোক বা Field Notes from a Waterborne Land—অঞ্চলের মানুষের জীবন বাদ দিয়ে যে ভ্রমণ হয় না, তা তিনি বারবার বুঝতে বাধ্য করেছেন।
এর মাঝেই আমিও পরিযায়ী শ্রমিকের মতো দেশ ছাড়লাম, আর হাতে নিয়ে এলাম অপুর দেশ। মাইগ্রেশন বলতে যে দেশভাগের দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা বাদেও, দেশভাগ, migration প্রতিদিন আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে ঘটে চলেছে—অজান্তে, অনিচ্ছায়। তাও পরিমলবাবু দেখালেন।
লেখার ভাষা সাবলীল বলেই খুব সহজে তিনি জায়গা করে নেন নতুন পাঠকদের মনে। পুরস্কারপ্রাপ্তির বক্তৃতায় তিনি বলেছেন—এই ফেসবুক, নেটফ্লিক্স, স্মার্টফোনের যুগে যারা আড়াই লক্ষ শব্দের বই পড়ে ফেলতে পারেন, তারা বিশেষ পাঠক। ঠিক একই কথা আমারও মনে হয়েছে—এই সহজলভ্য, লঘু, ওপর ওপর জেনে যাওয়ার যুগে কেউ যদি নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারেন, লিখে ফেলতে পারেন এমন এক সাতগাঁয়ের কথা, যা আজকের মানুষের কাছে কল্পনাতীত—তাহলে তিনি অবশ্যই বিশেষ লেখক।
আদিরাম থেকে দরপ খান, শাকাম্ভরী, রামাচার্য, রথীন, শিউলি হয়ে বাপ্পাদিত্যে নিয়ে এসে ফেলে যে মাঝি, তাঁর বিশেষত্ব আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
আহা দেখুন, দেখি, এতক্ষণেও বলিনি—আমি এত কথা লিখছি কেন? আমার প্রিয় লেখক পরিমল ভট্টাচার্য পেলেন আনন্দ পুরস্কার ২০২৬, সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরার জন্য। আর এ কারণেই আমি উৎফুল্ল। একালের শ্রেষ্ঠ লেখক তিনি। তাঁর বক্তৃতায় তিনি বলছেন সমরেশ বসুর কথা; আমি বলব মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা—এই সময়ের মানিকবাবু তিনি।
এরকম আরও লেখা পড়তে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন
আজকাল মানুষের কাজ আর কথায় বিস্তর ফারাক। সেখানে দাঁড়িয়ে পরিমলবাবু এক অন্য দৃষ্টান্ত। যতবার মেসেজ করেছি, উত্তর পেয়েছি—আন্তরিক উত্তর। যতবার তাঁর লেখা পড়েছি, মুগ্ধ হয়েছি—না, শুধু বইয়ের লেখা নয়, ফেসবুকের পোস্ট। তাতেও মুগ্ধ হয়েছি। কী প্রচণ্ড সচেতন নাগরিক।
যখন সবাই মেতেছি আনন্দ পুরস্কারের ঘোষণায়, তিনি নির্লিপ্ত, নিশ্চল—এক লাইনও লেখেননি সোশাল মিডিয়ায়। লক্ষ্যে অবিচল এক মানুষ। বক্তৃতার সময় ভোলেননি একটিও নাম—প্রকাশকের সঙ্গে দীর্ঘ দুই দশকের যে সম্পর্ক, তাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন।
যখন সবাই হাহাকার করছেন—তরুণ সমাজ বাংলা পড়ছে না, তখন ৬২ বছরের যুবক দৃপ্তচিত্তে দাঁড়িয়ে মান্যতা দিচ্ছেন না সে হাহুতাশের, বরং বলছেন—তরুণ সমাজ পড়ছে, আরও পড়বে, তারা টিকে থাকবে। মানুষকে অন্যভাবে দেখা, তার দুঃখ–বেদনা–সংগ্রাম প্রতিনিয়ত খুঁড়ে যাওয়ার নামই পরিমল ভট্টাচার্য।
আর আমি নিশ্চিত—এই খননকার্য চলবে, চলতেই হবে। এই সহজ অথচ গভীর সাধারণ মানুষের উপাখ্যান আর কে-ই বা লিখবে? যে জনজাতি প্রতিদিন চাপা পড়ে যেতে যেতে কালের স্রোতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, সেই জনজাতির খবর জলের তলা দিয়ে রটিয়ে দেবেন আমাদের পরিমল ভট্টাচার্য।
ইতিহাসে বাঙালিরা গর্ব করে লিখবেন—আমাদের এক পরিমল ভট্টাচার্য ছিলেন।
কলমে: সুঞ্জনা
